মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২

শিরোনাম

প্রচ্ছদ /   হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী দৌরাত্ম্য আতঙ্কে আওয়ামী লীগ

হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী দৌরাত্ম্য আতঙ্কে আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বৃহস্পতিবার, জুন ১৬, ২০২২

প্রিন্ট করুন

টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় থাকায় বহিরাগত, অনুপ্রবেশকারী ও সুবিধাবাদীদের দাপট বাড়ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে। এতে দলটির ত্যাগী নেতারা এখন কোণঠাসা। সঙ্গত কারণে এ সমস্যা নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা চিন্তিত এবং অনেকে আতঙ্কিত। সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় থাকায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিতে বহিরাগত ও অনুপ্রবেশকারীরা শুধু তৃণমূলেই নয়, দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম ও সহযোগী সংগঠনে ঢুকে পড়ছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের পর থেকেই অনুপ্রবেশ নিয়ে দলের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। জন্ম দিয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার। এতে দলের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে। ফলে অনুপ্রবেশের বিষয়টি নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকরাও চিন্তিত। ইতোমধ্যে অনুপ্রবেশের কারণ দলের নেতাদের কাছে চিহ্নিত এবং তা ঠেকাতে দল থেকে বারবার তাগিদও দেওয়া হচ্ছে। দলে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে বলেও একাধিকবার দলটির শীর্ষ নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এজন্য নতুন কমিটি গঠন করতে তালিকা এখন কেন্দ্রে পাঠাতে হয়। তারপরও যেন থামানো যাচ্ছে না অনুপ্রবেশ।

গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দীর্ঘদিনের সম্মেলন ও নতুন কমিটি নেই। ফলে মূল দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে প্রচুর পরিমাণে বহিরাগত ও অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়েছে। এ ছাড়া ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ ও যুব মহিলা লীগের সাংগঠনিক অবস্থা খুব দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। অনুপ্রবেশকারী এবং সুবিধাবাদীদের দাপটে প্রকৃত ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগে ২২তম জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে দলে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করেছে দলটি। এ নিয়ে দলে বেশ তোড়জোড় চলছে। অভিযোগ রয়েছে, অনুপ্রবেশকারীদের অধিকাংশই সরকারি দলের স্থানীয় সংসদ সদস্যদের হাত ধরে দলে এসেছে। এসব অনুপ্রবেশকারীকে যারা দলে ভিড়িয়েছেন, তাদের আগামী সম্মেলনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে না রাখার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, আকস্মিকভাবে কেউ দলের পদ পেয়ে যাওয়া বা দলে ঢুকে পড়া সাধারণ ঘটনা নয়। দলের ভ্রাতৃপ্রতিম ও সহযোগী সংগঠন বা উপকমিটিসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে পদ পাওয়া হালকা বিষয় নয় যে, দলের কেউ ইচ্ছা করেই দিয়ে দিতে পারে। যারা আসে তারা দলের প্রভাবশালী কোনো নেতার মাধ্যমে আসে। ফলে আমরা অনেক সময় কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারি না। তবে আগামীতে এ ব্যাপারে নেত্রী শেখ হাসিনা কঠোর অবস্থান নেবেন।

প্রসঙ্গত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করায় গত ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর বহিষ্কার হন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও গাজীপুর নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি মূলত এক প্রভাশালী নেতার হাত ধরেই আওয়ামী লীগে আসেন। এ ছাড়া ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায়। গত ১১ মে এ ঘটনায় করা মামলার মূল আসামি দেলোয়ার হোসেন ঢাকা মহানগর উত্তর মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী সাংগঠনিক সম্পাদকের চিঠিতেই তাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। একইভাবে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হেলেনা জাহাঙ্গীরকে নিয়ে বিতর্ক ওঠে। পরে বিভিন্ন অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কারের পর র‌্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হন তিনি। এর আগে আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন যুব মহিলা লীগের নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া। তাকেও সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। আর করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে প্রতারণার দায়ে বহিষ্কার হন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ করিম।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ঢালাওভাবে বহিরাগত বা অনুপ্রবেশকারী বললে হবে না। তবে যারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে, অর্থাৎ খুনি জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি এবং স্বাধীনতাবিরোধী তাদের কোনোভাবে দলে নেওয়া হবে না। আমরা এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছি। তবে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আওয়ামী লীগকে গ্রহণ করে তারা দলে এলে তো কোনো আপত্তি নেই। সেটা কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ, বাসদ বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যেকোনো রাজনীতি করে তারা চাইলে আসতেই পারে। সেটাকে আমরা অনুপ্রবেশকারী বা বহিরাগত বলতে পারি না। আর যদি কোনো ধান্ধাবাজ, মতলববাজ দলে অনুপ্রবেশ করে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা সতর্ক এবং তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।

আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা বলেন, দল ক্ষমতায় থাকার কারণে সুবিধাবাদীরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে অনুপ্রবেশ করছে। সুবিধাবাদীরা যাতে দলে ঢুকতে না পারে সেজন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে দীর্ঘদিন ধরেই বারবার সতর্ক করে আসছেন। তারপরও অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। একের পর এক অঘটনও
ঘটছে, যার দায় সরকার ও আওয়ামী লীগের ওপর এসে পড়ছে। তবে যারা উদ্দেশ্য নিয়ে দলে আসে বা অনুপ্রবেশ করে তারা ছোটখাটো কোনো নেতার মাধ্যমে আসে না, বেশ ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী কারও না কারও মাধ্যমেই আসে। যে ব্যক্তিকে দলে ঢোকানো বা পদ দেওয়া হচ্ছে তার সঙ্গে দলের কোনো প্রভাবশালী নেতার যোগাযোগ থাকে। তবে কোন প্রভাবশালী নেতার মাধ্যমে আসছে সেটা সহজেই বোঝা যায় না। এ অবস্থায় কিছু বলতে গিয়ে নিজেকে রোষানলে পড়তে হয়, সে আতঙ্ক কাজ করে অনেকের মধ্যে। তাই এ ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকানো বা এ সমস্যা সমাধান সহজে সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ও গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য ছিল। কিন্তু সেটা তো এখন গন কেস। তবে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগে যে কমিটি হয়েছে, সেটি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ দেখছে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। তারপরও কমিটিতে যাতে ত্যাগী, পরীক্ষিত ও শিক্ষিত নেতারা আসেন, সেটি খেয়াল রাখছি। কোনো অনুপ্রবেশকারী বা বহিরাগতরা দলে স্থান পাবে না। এজন্য আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। কোনো স্বাধীনতাবিরোধী দলে স্থান পাবে না। এদের কোনোভাবেই দলীয় কোনো পদে রাখা যাবে না। আর যাদের হাত ধরে দলে আসবে, তাদের বিরুদ্ধেও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নেবেন।

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে ভবিষ্যতে কোনো অনুপ্রবেশকারী বা বহিরাগত দলে নেওয়া যাবে না। আর যারা এখন দলে অনুপ্রবেশকারী বা বিএনপি-জামায়াত থেকে এসেছে, তাদের বাদ রেখে সম্মেলন আহ্বায়ক কমিটি করা হবে। এ ছাড়া যারা দলের মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী বা দলের কোনো নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, এমন কোনো এমপি হলেও তাদের দলের কোনো পদ-পদবিতে রাখা হবে না। সত্যিকার অর্থে কিছু কিছু অনুপ্রবেশকারীকে নিয়ে আমরা আশঙ্কায় আছি। তাদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে, ত্যাগীরাও কোণঠাসা। তবে নেত্রীর নির্দেশ রয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের আর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন