শুক্রবার, ১২ আগষ্ট ২০২২

শিরোনাম

প্রচ্ছদ /   কুরিয়ার সার্ভিস ঘিরে চলছে অপরাধ!

কুরিয়ার সার্ভিস ঘিরে চলছে অপরাধ!

নিজস্ব প্রতিবেদক

সোমবার, জুন ৭, ২০২১

প্রিন্ট করুন

ঢাকা :সারা দেশের বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে আবারো নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। মাদক, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র কারবারিরা দীর্ঘদিন ধরে কুরিয়ার সার্ভিসকে তাদের নিরাপদ বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। ইতিপূর্বে দেশি ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আসা বিভিন্ন মাদক জব্দের পর বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। অপরাধ ও মাদক পাচার বন্ধে কুরিয়ার সার্ভিসের বিভিন্ন অসঙ্গতি রোধে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। জোর দেওয়া হয় সব কুরিয়ার সার্ভিসকে  স্ক্যানার মেশিন ব্যবহারের। কিন্তু নির্দেশনাগুলোর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই মানছে না। এদিকে শত বছরের পুরনো পোস্টাল আইন (১৮৯৮) দিয়ে চলা কুরিয়ার সার্ভিসের কিছু ধারা সংশোধন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকার এ বিধিমালার কয়েকটি ধারা সংশোধন করে কুরিয়ার সার্ভিস বিধিমালা, ২০১১ তৈরি করে। কিন্তু কয়েকজন ব্যবসায়ী আদালতে রিট করলে তা স্থগিত হয়ে আছে।

সম্প্রতি ভয়ঙ্কর এলএসডিসহ বিভিন্ন মাদকের কয়েকটি চালান উদ্ধারের পর আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চিত হয়েছে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেই এসব মাদক দেশে আনা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এবং কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে বৈঠক করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখানে কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পরিবহন রোধে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জানা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরে অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজির টাকা হস্তান্তরে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। শুধু দেশে নয়, দেশে কাজ করা বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও মাদক পাচারের ঘটনা ঘটেছে। ২০১২ ইন্টারপোল এ বিষয়ে সতর্কবার্তা পাঠায় পুলিশ সদর দপ্তরে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব চোরাকারবারিকে ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হয়। একই সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিস ও বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি যেসব কুরিয়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নেই তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, কুরিয়ার সার্ভিসের সব অফিসে স্ক্যানিং বসানো, প্রাপক ও প্রেরকের জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা সহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে। এতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এবং কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধুমাত্র একটি স্ক্যানার মেশিনে অধিকাংশ অপরাধ দমন করা সম্ভব হলেও কুরিয়ার সার্ভিসগুলো এ বিষয়ে নির্বিকার। তাদের স্ক্যানার মেশিন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি ভয়ানক মাদক এলএসডিসহ কয়েক যুবককে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, তারা অনলাইনের মাধ্যমে বিদেশ থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে এসব মাদক নিয়ে আসে। কয়েক বছর আগে অপহরণ করে মুক্তিপণের টাকা আনতে গিয়ে শান্তি নগরে এক কুরিয়ার সার্ভিসের শাখা অফিস থেকে গ্রেপ্তার করা হয় রুবেল ও হাবিব নামে দুই যুবককে। আরেকটি কুরিয়ার সার্ভিসের বেনাপোল শাখা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ১৫৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে গোয়েন্দারা।

শুধু দেশের ভেতরেই নয়, কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের ভেতর থেকেও বিদেশে মাদক পাচারের ঘটনা ঘটছে। কয়েক বছর আগে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্ট একটি শার্টের পার্সেল থেকে আধা কেজি হেরোইন উদ্ধার করা হয়। ওই পার্সেলে প্রেরকের ঠিকানা ছিল ১০৩ দিলু রোড, মগবাজার। এ ঘটনার কয়েক মাস আগে জুতার সোলের ভেতর যুক্তরাজ্যের হেরোইন পাচারের ঘটনা ধরা পড়ে। ওই সময় গ্রেপ্তারকৃত তুহিন জানিয়েছিলেন, তিনি ডিএইচএল ও অ্যারামেক্সসহ বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যের বার্মিহামে অবস্থিত তার খালাতো ভাই শাহ আলমের কাছে হেরোইন পাচার করতেন।

কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হাফিজুর রহমান পুলক বলেন, ব্যয়বহুল হওয়ায় কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে স্ক্যানিং মেশিন কেনা সম্ভব হচ্ছে না। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কিছু অসাধু ব্যক্তি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করছে উল্লেখ করে পুলক জানান, এজন্য তারা বুকিং অফিসারদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া নিয়মিত পার্টি না হলে বুকিংদাতার বিষয়ে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. বশির জানান, কয়েক বছর আগে ইন্টারপোল আর্ন্তজাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের বিষয়ে সতর্কবার্তা পাঠানোর পর বুকিং -এর বিষয়ে সতর্কতা  অবলম্বন করা  হচ্ছে। বর্তমানে বুকিং দেওয়ার সময় যিনি বুকিং দিতে আসছেন তার ন্যাশনাল আইডি কার্ড অথবা ড্রাইভিং লাইসেন্স অথবা পাসপোর্টের ফটোকপি তারা রেখে দিচ্ছেন। এই তিনটির যে কোনো একটি ছাড়া আর্ন্তজাতিক কোনো কুরিয়ার সার্ভিস কোনো পার্সেল বুকিং নিচ্ছে না। বুকিংদাতার ফটো আইডি এবং ফোন নম্বর কাস্টমসকেও দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিদেশে পাঠানো প্রতিটি পার্সেল তারা সিভিল এভিয়েশনের স্ক্যানারের মাধ্যমে স্ক্যানিং করিয়ে নিচ্ছেন। এজন্য সিভিল এভিয়েশনকে কেজিপ্রতি চার্জ দিতে হচ্ছে। স্ক্যানিং মেশিনের দাম বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে কোনো আর্ন্তজাতিক কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানও স্ক্যানিং মেশিন ব্যবহার করে না। পুলক জানান, সংশোধিত বিধিমালা কার্যকর করা গেলে এই সেক্টরে স্বচ্ছতা আসবে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন